নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ১০০ শিশু জন্মগ্রহণ করছে। শিক্ষার অভাব, পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকা, রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামোর পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের অসচেতনতা এই উচ্চ জন্মহারের অন্যতম কারণ। শরণার্থী আশ্রয় শিবিরগুলোতে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকা বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদি ভরণ-পোষণের বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। এতে করে দুটির বেশি সন্তান নয়, একটি হলে ভালো হয়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্ষেত্রে সরকারের এই পরিবার পরিকল্পনা নীতির সুফল মিলছে না।
এর আগে রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত জন্মহার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু এটিকে মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে দেখিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)। দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে আমার দেশকে বলেন, ক্যাম্পে জন্মহার নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক ও সীমিত কিছু উদ্যোগ ছিল। কিন্তু বিষয়টি ইউএনএইচসিআরের নজরে আনা হলে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কার কথা বলে আমাদের সতর্ক করেন। তবে এ বিষয়ে ইউএনএইচসিআরের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউএনএইচসিআরের নিবন্ধন তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ভাসানচরে ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে পুরোনো নিবন্ধিত দুটি ক্যাম্প, নতুন নিবন্ধিত একটি ক্যাম্প এবং ভাসানচরে একটি পৃথক আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নতুন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এক লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৬ জন। একই সময়ে ক্যাম্পগুলোতে জন্মহারও বেড়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হলে জীবন নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া নবজাতকের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ৯১ হাজার ৩৯৫ জন। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৩৬ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় তিন হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে ক্যাম্পগুলোতে, যা প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন।
রোহিঙ্গাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যাবাসনে দীর্ঘসূত্রতায় ক্যাম্পে নতুন প্রজন্ম দ্রুত বেড়ে উঠছে। এতে সংকট শুধু মানবিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং বাংলাদেশের জন্য বড় সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার রোহিঙ্গা সংকট বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদি ও অত্যন্ত সংবেদনশীল সংকট হিসেবে দেখছেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা অত্যন্ত রক্ষণশীল সামাজিক কাঠামো থেকে আসায় তাদের পরিবার পরিকল্পনায় উদ্বুদ্ধ করা সহজ নয়। এ সমস্যার কোনো তাৎক্ষণিক বা ‘চটজলদি’ সমাধানও নেই।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া স্থবির থাকলে ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যা ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ আগামীতে মানবপাচার বৃদ্ধিসহ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সারওয়ার আমার দেশকে বলেন, শুরুতে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে রোহিঙ্গাদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করা হলে তারা এটিকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখেছিল। তবে বর্তমানে ডিডিএফপি, ইউএনএফপিএ, আরআরআরসি ও সিভিল সার্জন অফিস যৌথভাবে ‘ফ্যামিলি প্ল্যানিং স্ট্র্যাটেজি ২০২২-২০২৫’ বাস্তবায়ন করছে, যা ইতোমধ্যে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদ পর্যন্ত হালনাগাদ করা হয়েছে।